অপেক্ষার আগুন শেষ পর্ব
আগের পর্ব
৫-৬ মিনিট ধরে এই মায়াবী আদর দেওয়ার পর দেখলাম ঈশিতা আবার উত্তেজনায় কাঁপছে।
ওর শরীরের সেই উষ্ণতা আবার ফিরে আসতেই আমি ওকে বিছানার মাঝখানে নিয়ে এলাম। ওকে আবার নিচে শুইয়ে দিয়ে আমি ওর ওপরে উঠলাম ঠিক প্রথম পজিশনটার মতো। এবার আমাদের দুজনেরই উত্তেজনার পারদ একদম শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। আমি আমার শরীরের সবটুকু ভার ওর ওপর দিয়ে তার ভোদায় আমার ধোক ঢুকিয়ে পূর্ণ উদ্যমে ছন্দময় স্টোক মারা শুরু করলাম।
আমাদের শরীরের প্রতিটি ঘর্ষণে এক অদ্ভুত মাদকতা ছিল। ঈশিতা এবার আর ব্যথায় কাঁদছিল না, বরং ও আমার সাথে তালে তাল মিলিয়ে কোমর দোলাচ্ছিল। প্রতিটি ধাক্কায় ওর দুধ দুটো লাটিমের মতো কাঁপছিল আর ঘরজুড়ে আমাদের শরীরের মাংসল ঠপ-ঠপ ঘর্ষণের শব্দ এক বুনো ছন্দ তৈরি করছিল। ঈশিতা মুখ হাঁ করে নিশ্বাস নিতে নিতে বলতে লাগল, “উহ্… আআহ্… বিরেন… জোরে… আরও জোরে… উফফফ… অঃহ্ বিরেন… অমা গো…!
আমি চুদার গতি আরও বাড়িয়ে দিলাম। ঈশিতা যন্ত্রণায় আর সুখে কোকিয়ে উঠে বলল,
বিরেন… একটু আস্তে… উফফ… ওখানটা একদম জ্বলে যাচ্ছে… মরে যাচ্ছি আমি… কিন্তু তুমি থেমো না… ওহ বিরেন… তুমি এত পাগল কেন? আহ্… কী দারুণ করছো তুমি… ইসসস… উফ্ফ্! ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ওর সেই দীর্ঘ গোঙানি আর আমাদের হাপানোর শব্দগুলো একাকার হয়ে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস ঘরটা সাউন্ডপ্রুফ ছিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম আমার ধোনের ভেতর থেকে সবটুকু উষ্ণ বীর্য তীরের মতো ওর ভোদার গভীরে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। ঠিক একই সময়ে ঈশিতাও এক তীব্র চিৎকারে “আয়ায়ায়ায়ায়ায়াহ্… উফফ বিরেন… আমি শেষ… উফফ আল্লা রে… মরে গেলাম…!” বলে আমার কাঁধ কামড়ে ধরল এবং ওর শরীরটা থরথর করে কেঁপে নিস্তেজ হয়ে গেল। আমরা দুজনেই আমাদের চূড়ান্ত বীর্যপাত আর অর্গাজমের এক অপার্থিব সুখে ডুবে গেলাম।
ঈশিতার সেই গোলাপি ভোদার ভেতরটা আমার উষ্ণ বীর্যে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। আমি ক্লান্ত হয়ে ওর বুকের ওপরই মাথা রাখলাম, আর আমরা দুজনেই হাঁপাতে হাঁপাতে একে অপরের ঘাম ভেজা শরীর জড়িয়ে ধরে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। বাসর রাতের সেই শান্ত পরিবেশে শুধু আমাদের দ্রুত হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। মিলনের সেই উত্তাল মুহূর্তগুলো শেষে আমরা দুজনেই ঘামভেজা শরীরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলাম।
পরে আমি ঈশিতার উপর থেকে সরে পাশে শুয়ে আমি তাকে আমার বুকের ওপর টেনে নিলাম। ও ওর মাথাটা আমার প্রশস্ত বুকের ওপর রাখল, আর ওর ধবধবে সাদা শরীরটা আমার শরীরের উষ্ণতায় যেন মিশে যেতে চাইল। আমি আলতো করে ওর এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে দিচ্ছিলাম।
ঘরটা এখন একদম নিঝুম। শুধু আমাদের দুজনের অনিয়মিত নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল।
ঈশিতা অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না, শুধু আমার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি শুনছিল। কিছুক্ষণ পর ও খুব মায়াবী আর কিছুটা লাজুক স্বরে আমার বুকের লোমে আঙুল বুলিয়ে বলল, “বিরেন…”
আমি ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বললাম, “বলো লক্ষ্মীটি।”
ও একটু থেমে ধরা গলায় ফিসফিস করে বলল, “তুমি যেভাবে আজ আমাকে নিজের করে নিলে, আমি সারাজীবন এটা মনে রাখব। সত্যি বিরেন, তোমার আদর করার স্টাইল আর শক্তি দেখে আমি তো অবাক হয়ে গেছি! এত ভালো কি করে পারো তুমি? কিন্তু… ওখানটায় না খুব ব্যথা করছে গো। তুমি যখন জোরে জোরে দিচ্ছিলে, তখন মনে হচ্ছিল সব ছিঁড়ে যাচ্ছে। ভেতরটা এখন জ্বলে যাচ্ছে খুব। তবে তুমি আমাকে যে তৃপ্তি দিয়েছ, সেই সুখের কাছে এই ব্যথা কিছুই না।”
হানিমুন – দার্জিলিংয়ের সেই রাত.
সন্ধ্যা নামার পর পাহাড়ের শহরটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। জানালার বাইরে কুয়াশা ধীরে ধীরে নেমে আসছে। দূরের আলো ঝাপসা। ঠান্ডা হাওয়া কাচে ধাক্কা দিচ্ছে।
ঘরের ভেতর হালকা হলুদ আলো।
ঈশিতা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে। লাল উলের শাল কাঁধে, চুল খোলা। ঠান্ডায় গাল একটু লাল হয়ে গেছে।
বিরেন চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকে দেখছিল।
বিরেন: “এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে ঠান্ডা লাগবে।”
ঈশিতা (না ঘুরেই): “তুমি তো আছো গরম রাখার জন্য।”
বিরেন হেসে পিছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের উষ্ণতা ঈশিতার পিঠ ছুঁয়ে গেল। ঈশিতার নিঃশ্বাস একটু থেমে গেল।
ঈশিতা ধীরে বলল
ঈশিতা: “এভাবে জড়িয়ে ধরলে ঠান্ডা তো দূর হবে… কিন্তু অন্য কিছু শুরু হবে।”
বিরেন কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল
বিরেন: “সেটাই তো চাই।”
ঈশিতা এবার ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। দু’জনের চোখে এক অদ্ভুত টান।
বিরেন তার চুল সরিয়ে কপালে আলতো চুমু রাখল। তারপর গালে… তারপর ঠোঁটে।
চুম্বনটা প্রথমে কোমল ছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গভীর হয়ে উঠল।
ঈশিতা হাত তুলে বিরেনের কাঁধে রাখল।
ঈশিতা: “আজ তুমি একটু অন্যরকম লাগছো…”
বিরেন: “আজ আমি তোমাকে পুরোটা চাই।”
ঈশিতার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। সে ধীরে বিরেনের শার্টের কলার ধরে টেনে কাছে আনল।
ঈশিতা: “তাহলে দেরি করছো কেন?”
বিরেন তাকে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে নিয়ে এলো। বাইরে কুয়াশা জমছে, ভেতরে ঘরের বাতাস গরম হয়ে উঠছে।
বিরেন সময় নিচ্ছিল। তার আঙুল ঈশিতার হাত বেয়ে কাঁধে উঠছে। ঈশিতা চোখ বন্ধ করে অনুভব করছে প্রতিটা স্পর্শ।
ঈশিতা (চোখ বন্ধ করে): “এভাবে তাকিও না…”
বিরেন (হালকা গলায়): “তোমাকে না দেখে পারছি না।”
ঈশিতা একটু লজ্জা পেয়েও এবার নিজেই এগিয়ে এলো। তার ঠোঁট বিরেনের গলায় ছুঁয়ে গেল। বিরেনের শরীর কেঁপে উঠল।
বিরেন: “ঈশি… তুমি জানো না তুমি কি করছো।”
ঈশিতা: “জানি… আজ আমি থামবো না।”
ঘরের আলো আরও ম্লান হয়ে এসেছে।
তাদের শ্বাস একসাথে মিশে যাচ্ছে।
বিরেন এবার আর লাজুক নয় সে আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল, গভীর।
ঈশিতা তার কাঁধ আঁকড়ে ধরে বলল
ঈশিতা: “আজকের রাতটা মনে থাকবে তো?”
বিরেন: “সারা জীবন।”
সেই রাতটা ছিল দীর্ঘ।
প্রথমবারের মতো তারা একে অপরকে শুধু স্পর্শ করেনি সম্পূর্ণভাবে অনুভব করেছে।
বাইরে পাহাড়ের ঠান্ডা, ভেতরে তাদের শরীরের আগুন।
শেষে, ক্লান্ত কিন্তু তৃপ্ত হাসি নিয়ে ঈশিতা বিরেনের বুকে মাথা রাখল।
ঈশিতা: “আমাদের বাচ্চা হলে তাকে এই জায়গায় নিয়ে আসবো।”
বিরেন তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল
বিরেন: “নিশ্চয়ই… এই রাতের মতোই আমাদের ভবিষ্যৎও উষ্ণ হবে।”
জানালার বাইরে কুয়াশা ঘন হয়ে গেছে।
ভেতরে তাদের ভালোবাসা আরও ঘন।
দার্জিলিং থেকে ফেরার পর কয়েক মাস যেন উড়েই গেল। ঘর, কাজ, একসাথে রান্না করা, হঠাৎ মাঝরাতে গল্প সবকিছুতেই নতুন বিয়ের উচ্ছ্বাস। তাদের ঘরে তখনও প্রতিদিনের ছোঁয়া ছিল স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত। ভালোবাসা যেন কোনো নির্দিষ্ট সময় মানত না।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে বিরেন প্রায়ই ঈশিতাকে কাছে টেনে নিত। কখনও রান্নাঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, কখনও টিভি দেখতে দেখতে হঠাৎ এক টান। ঈশিতা ভান করে বকাঝকা করত, কিন্তু চোখের কোণে হাসি থাকত। তাদের শরীরের ভাষা তখনও সহজ, সাবলীল, চেনা ছন্দে বাঁধা।
সেই সময়টায় প্রায় প্রতিদিনই তাদের ঘনিষ্ঠতা হতো। দায়িত্বের মতো নয় চাওয়ার মতো। একে অপরকে পাওয়া যেন একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। মিলনের পর ঈশিতা বিরেনের বুকে মাথা রেখে ভবিষ্যতের কথা বলত। তাদের কথায় বারবার উঠে আসত ছোট্ট কারও হাসি, কারও নাম রাখা, কারও স্কুলে যাওয়া।
ঈশিতা ভাবত, যদি ছেলে হয় তাহলে বিরেনের মতো শান্ত হোক। আর যদি মেয়ে হয়, তার চুল বাঁধবে নিজে হাতে। বিরেন হেসে বলত, মেয়েই হবে কারণ সে নাকি ঈশিতার মতো জেদি হবে। তারা এমনভাবে ভবিষ্যৎ কল্পনা করত, যেন সব ঠিক হয়ে গেছে।
প্রথম দুই-তিন বছর সেই কল্পনা ভরসা হয়ে ছিল। প্রতিটা মাসে অপেক্ষা, তারপর হতাশা তবু আশা ভাঙেনি। শারীরিক সম্পর্কেও তখন কোনো ঘাটতি ছিল না। ভালোবাসা ছিল গভীর, ছোঁয়া ছিল উষ্ণ। তারা ভাবত, সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কিন্তু বছর গড়াতে গড়াতে সেই স্বতঃস্ফূর্ততা একটু বদলাতে শুরু করল। কাজের চাপ, শরীরের ক্লান্তি, বয়সের ছাপ সব মিলিয়ে আগের মতো প্রতিদিন আর সম্ভব হতো না। তবুও দু’দিনে একদিন তারা কাছাকাছি আসত। একে অপরকে হারাতে দেয়নি। শুধু ছন্দ বদলেছে।
ঈশিতা মাঝে মাঝে অনুভব করত তাদের সম্পর্কের ভেতর অদৃশ্য এক চাপ ঢুকে পড়েছে। আগে যেখানে ছোঁয়া মানে ছিল আনন্দ, এখন কখনও কখনও মনে হতো তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রত্যাশা। প্রত্যাশা না পূরণ হলে নিঃশব্দ কষ্ট।
বিরেনও বুঝত। কখনও মিলনের পর সে চুপচাপ শুয়ে থাকত, ছাদের দিকে তাকিয়ে। তার মনে হতো, সে যেন ঈশিতাকে কিছু দিতে পারছে না। বয়স তখন পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না সবসময়। সময়ও আগের মতো দীর্ঘ থাকে না।
তবুও ভালোবাসা ছিল। আদর ছিল।
কিন্তু ফল ছিল না।
চতুর্দশ বছর পেরিয়ে গেল।
ঈশিতার বয়স এখন আটচল্লিশ। বিরেন পঞ্চান্ন।
ঘরে এখনও দু’জনের হাসি আছে, কিন্তু তৃতীয় কারও শব্দ নেই।
এখন আর প্রতিদিন নয়। দু’দিনে একদিনও কখনও সম্ভব হয় না। শরীর ক্লান্ত হয় দ্রুত। তবুও তারা চেষ্টা করে। কারণ শুধু সন্তান নয় একটা অভ্যাস, একটা বন্ধন তাদের টেনে রাখে।
এক রাতে ঈশিতা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলে পাক ধরা দেখে থমকে গেল। সে মনে মনে হিসেব করল চৌদ্দ বছর। কতবার তারা আশা করেছে, কতবার নিজেদের নতুন করে সাজিয়েছে, কতবার মিলনের পর চোখ বন্ধ করে ভেবেছে এইবার হয়তো…
কিন্তু হয়নি।
বিরেন পিছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। স্পর্শটা আগের মতোই উষ্ণ, শুধু সময়টা ছোট। ঈশিতা বুঝল, তাদের বয়স বেড়েছে, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা পুরো মুছে যায়নি। শুধু বাস্তবতার সঙ্গে মিশে গেছে।
রাতে বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকতে থাকতে ঈশিতার মনে হতো তারা কি খুব দেরি করে ফেলেছে?
বিরেনের মনে হতো ঈশিতার চোখের সেই অদেখা শূন্যতার জন্য সে দায়ী কিনা।
তবুও তারা একে অপরকে ছাড়েনি।
আদর এখনও আছে।
সোহাগ এখনও আছে।
কিন্তু সেই স্বপ্নটা ছোট্ট পায়ের শব্দ অদৃশ্যই রয়ে গেছে।
এভাবেই চৌদ্দ বছর কেটে গেল।
এক সন্ধ্যায়, নীরব ডাইনিং টেবিলে বসে থাকতে থাকতে তাদের দু’জনের মনেই একই প্রশ্ন ঘুরছিল এবার কি ডাক্তার দেখানো উচিত?
কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের আগে, তাদের চোখে ছিল দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি আর অটুট ভালোবাসার আলো।
নতুন অধ্যায়ের শুরু যেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
ডাক্তারের চেম্বারে
সাদা দেওয়াল, টেবিলের ওপর রিপোর্টের ফাইল।
ঈশিতা আর বিরেন পাশাপাশি বসে। দু’জনের হাত একসাথে ধরা।
ডা. সেন চশমার উপর দিয়ে রিপোর্ট দেখছিলেন। বয়স পঞ্চান্ন, অভিজ্ঞ চোখে শান্ত ভরসা।
ডা. সেন: “দেখুন, বয়স অবশ্যই একটা ফ্যাক্টর। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেছে এমন না।”
ঈশিতা চুপ করে শুনছিল। তার চোখে টেনশন স্পষ্ট।
বিরেন: “ডাক্তারবাবু… চৌদ্দ বছর হয়ে গেছে। আমরা দেরি করে ফেলেছি না?”
ডা. সেন হালকা হাসলেন।
ডা. সেন: “দেরি হয়েছে, কিন্তু অসম্ভব না। আপনারা এতদিন চেষ্টা করেছেন, কিন্তু হয়তো সঠিক সময় মেনে করেননি।”
ঈশিতা একটু ঝুঁকে বলল
ঈশিতা: “সঠিক সময় মানে?”
ডা. সেন: “ঈশিতার পিরিয়ড শেষ হওয়ার পরের কয়েকটা দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়টায় নিয়ম করে, কিন্তু চাপ না নিয়ে মিলিত হবেন। শরীরকে সময় দেবেন। তাড়াহুড়ো না। মানসিক চাপ একদম কমাতে হবে।”
বিরেন চুপচাপ শুনছিল।
ডা. সেন আবার বললেন
ডা. সেন: “মনে রাখবেন, দায়িত্ব হিসেবে না। ভালোবাসা হিসেবে। আনন্দ থাকবে, স্বাভাবিকতা থাকবে। শরীর যতটা সাড়া দেবে, ততটাই। বাকিটা সময়ের ওপর ছেড়ে দিন।”
ঈশিতার চোখে প্রথমবারের মতো আলো দেখা গেল।
ঈশিতা: “তাহলে… আমাদের এখনও সুযোগ আছে?”
ডা. সেন মাথা নেড়ে বললেন
ডা. সেন: “আছে। তবে ধৈর্য রাখতে হবে।”
বাড়ি ফেরার পর
গাড়িতে ফেরার সময় দু’জনেই চুপ।
কিন্তু সেই চুপে হতাশা নেই বরং অদ্ভুত উত্তেজনা।
বাড়ি ঢুকেই ঈশিতা জানালার পাশে দাঁড়াল।
বিরেন পিছন থেকে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।
বিরেন: “কেমন লাগছে?”
ঈশিতা ধীরে বলল
ঈশিতা: “মনে হচ্ছে আবার নতুন করে শুরু করছি।”
বিরেন তার চুল সরিয়ে কপালে চুমু রাখল।
বিরেন: “এইবার কোনো চাপ না। শুধু আমরা।”
কয়েকদিন পর, পিরিয়ড শেষ।
ঘরে হালকা আলো। জানালা বন্ধ। বাইরে নীরব রাত।
ঈশিতা আজ একটু আলাদা করে সাজেনি। তবুও তার চোখে প্রত্যাশা।
বিরেন ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
আজ তার ছোঁয়ায় আগের মতো অস্থিরতা নেই আছে সচেতন কোমলতা।
ঈশিতা তার বুকের ওপর হাত রাখল।
তার শ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হচ্ছে।
বিরেন খুব ধীরে তাকে কাছে টানল।
কোনো তাড়াহুড়ো নয়।
প্রথমে দীর্ঘ আলিঙ্গন। তারপর কপালে, গালে, ঠোঁটে নরম চুম্বন।
ঈশিতা চোখ বন্ধ করে বলল
ঈশিতা: “আজ অন্যরকম লাগছে।”
বিরেন ফিসফিস করে
বিরেন: “কারণ আজ আশা আছে।”
ধীরে ধীরে উত্তাপ বাড়ল।
তাদের শরীরের ছন্দ এবার নিয়ন্ত্রিত, সচেতন।
বিরেন সময় নিচ্ছে। ঈশিতা প্রতিটা স্পর্শ অনুভব করছে।
ঘরের বাতাস গরম হয়ে উঠছে।
ঈশিতা বিরেনের কাঁধ আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করল
ঈশিতা: “থামবে না…”
বিরেন: “না… আজ না।”
রাতটা ছিল দীর্ঘ না, কিন্তু গভীর।
শেষে দু’জনেই পাশাপাশি শুয়ে, হাত ধরে, নিঃশ্বাস সামলাচ্ছিল।
ঈশিতা মাথা ঘুরিয়ে বলল
ঈশিতা: “যদি হয়?”
বিরেন তার হাত শক্ত করে ধরল
বিরেন: “হবে। আমি বিশ্বাস করি।”
ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে শুধু তাদের দু’জনের উষ্ণতা আর নতুন আশার স্পন্দন রয়ে গেল।
ডাক্তারের পরামর্শ মেনে তারা সময় গুনছিল।
ঈশিতার পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর কয়েকটা দিন এই কয়েকটা দিন যেন আবার নতুন করে উত্তেজনা নিয়ে এলো।
আরও তীব্র এক রাত
সেদিন সন্ধ্যায় বিরেন অফিস থেকে একটু আগেই ফিরেছিল।
ঘরে ঢুকে দেখল ঈশিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। চুল খোলা, হালকা একটা শাড়ি, কোনো বাড়তি সাজ নেই তবুও তার মধ্যে এক অদ্ভুত আকর্ষণ।
বাতাসে হালকা সুগন্ধ।
ঈশিতা ঘুরে তাকাতেই বিরেন বুঝল আজ তার চোখে ভয় নেই, আছে প্রত্যাশা।
সারাদিন যেন দু’জনেই অদৃশ্য একটা টান অনুভব করছিল।
রাত নামতেই ঘরের আলো একটু কমিয়ে দিল ঈশিতা।
টেবিলের ওপর ছোট্ট একটা মোমবাতি জ্বলছে।
বিরেন ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেল।
কোনো কথা নেই প্রথমে। শুধু চোখে চোখ।
তারপর আলতো করে ঈশিতার হাত ধরল।
এই স্পর্শে আগের দিনের চেনা উত্তাপ ছিল, কিন্তু আজ একটু বেশি তীব্র।
ঈশিতার শ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছিল।
সে বিরেনের বুকে হাত রেখে কাছে টেনে নিল।
আজ তাদের মধ্যে কোনো দ্বিধা ছিল না।
বিরেন এবার আর লাজুক নয়, আবারও তরুণের মতো আগ্রহী।
কিন্তু তাড়াহুড়োও নেই সে সময় নিচ্ছে, ধৈর্য রাখছে।
ঈশিতা অনুভব করছিল বছরের ক্লান্তি যেন সরে যাচ্ছে।
তার আঙুল বিরেনের কাঁধে, চুলে, পিঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তাদের শ্বাস একসাথে মিশে যাচ্ছে। এই রাতটা আগের চেয়ে বেশি তীব্র ছিল। মাঝে মাঝে ঈশিতা নিজেই বিরেনকে টেনে নিচ্ছিল, যেন হারিয়ে ফেলতে চায় সব সংশয়। ঘরের বাতাস গরম হয়ে উঠেছিল। মোমবাতির আলোয় তাদের ছায়া দুলছিল। শেষে দু’জনেই ক্লান্ত, কিন্তু তৃপ্ত। বিরেন ঈশিতাকে জড়িয়ে ধরে ছিল অনেকক্ষণ। ঈশিতা চুপ করে তার বুকে মাথা রেখে ছিল। আজ তার মনে হচ্ছিল এইবার কিছু বদলাবে।
কয়েকদিন পর
সময়ের সাথে সাথে সেই রাতের স্মৃতি মনে পড়ছিল বারবার।
কয়েকদিন পর এক সকালে ঈশিতা অদ্ভুত কিছু অনুভব করল।
হালকা বমিভাব।
শরীর একটু ভারী লাগছে।
তারিখের হিসেব মিলিয়ে দেখল পিরিয়ডের সময় প্রায় হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও শুরু হয়নি।
সে প্রথমে কাউকে কিছু বলল না। নিজেই নিজেকে বোঝাতে লাগল হয়তো শরীরের পরিবর্তন, হয়তো কাকতালীয়। কিন্তু পরদিন সকালে আবার একইরকম অস্বস্তি।
আরও একটা জিনিস অদ্ভুত রকম ক্লান্তি। ঈশিতা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকাল। তার চোখে ভয় আর আশার মিশ্রণ।
সে ধীরে ধীরে ড্রয়ার খুলে একটা পুরোনো ক্যালেন্ডার বের করল। তারিখ মিলিয়ে নিল। বিরেন তখনও ঘুমোচ্ছে।
ঈশিতা বিছানার পাশে বসে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে ভাবল “হয়তো… এইবার?” তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। সে সিদ্ধান্ত নিল, আর একদিন অপেক্ষা করবে। যদি ততদিনেও কিছু না হয়… তার চোখের কোণে অদ্ভুত এক আলো ফুটে উঠল।
চৌদ্দ বছরের অপেক্ষা হয়তো এবার সত্যি হতে চলেছে।
সেই সকাল
পরের দিন ভোরে ঈশিতার ঘুম ভাঙল খুব তাড়াতাড়ি।
ঘর তখনও আধো অন্ধকার। বিরেন গভীর ঘুমে।তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। ড্রয়ার থেকে ধীরে টেস্ট কিটটা বের করল। বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই হাত কেঁপে উঠল।
কয়েক মিনিট… কিন্তু মনে হচ্ছিল সময় থেমে গেছে। সে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ধীরে চোখ খুলল।
দুটি দাগ। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারল না। আবার তাকাল। দুটি স্পষ্ট গোলাপি দাগ। তার চোখ ভিজে উঠল।
ঠোঁট কাঁপছে। সে কিছুক্ষণ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চৌদ্দ বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য রাত, অসংখ্য হতাশা সব একসাথে মনে পড়ছে।
ঈশিতা ধীরে ঘরে ফিরে এল। বিরেন তখনও ঘুমোচ্ছে, এক হাত বালিশের পাশে। ঈশিতা বিছানার ধারে বসে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। বিরেন চোখ মেলে তাকাল ঘুম জড়ানো গলায় বলল, “এত সকালে?” ঈশিতা কিছু বলল না। শুধু তার হাতে টেস্ট কিটটা ধরিয়ে দিল। বিরেন প্রথমে বুঝতে পারল না। তারপর চোখ বড় হয়ে গেল। সে উঠে বসে আবার তাকাল।
“এটা… এটা কি সত্যি?”
ঈশিতা চোখের জল সামলে মাথা নেড়ে বলল
“
হয়তো… হয়তো আমাদের অপেক্ষা শেষ।” বিরেন কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারল না। তারপর হঠাৎ ঈশিতাকে জড়িয়ে ধরল। ওই আলিঙ্গনে ছিল অবিশ্বাস, স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা। বিরেন ফিসফিস করে বলল “আমরা পারলাম… এত বছর পরও পারলাম…” ঈশিতা তার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল।
এই কান্না কষ্টের নয় মুক্তির।
কয়েক ঘণ্টা পর তারা ডাক্তারের কাছে গেল। রিপোর্ট দেখে ডা. সেন মৃদু হেসে বললেন “অভিনন্দন। খুব শুরুর দিক, কিন্তু সবকিছু পজিটিভ।” ঈশিতা আর বিরেন একে অপরের দিকে তাকাল। চোখে সেই পুরোনো ঝিলিক।
বাড়ি ফিরে তারা দু’জনেই চুপচাপ ছিল কিছুক্ষণ।
ঘরের বাতাস যেন আলাদা। বিরেন ধীরে ঈশিতার হাত ধরল।
“এখন তোমার খেয়াল রাখতে হবে।” ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,
“এত বছর পরে তুমি আবার আমাকে নতুন করে ভালোবাসবে?”
বিরেন তার কপালে নরম চুমু রাখল।
“আমি তো কখনও থামিনি।”
সেই রাতে তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল কোমল। তীব্রতার বদলে ছিল যত্ন। আদরের ভেতরে ছিল ভয় কিছু যেন না হয়।
ঈশিতা অনুভব করছিল তার ভেতরে নতুন জীবন শুরু হয়েছে। বিরেন তার পেটে আলতো হাত রেখে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। চৌদ্দ বছরের অপেক্ষা অবশেষে আলো হয়ে উঠেছে।
সকালের আলোটা সেদিন অন্যরকম ছিল।
জানালার পর্দা ভেদ করে যে রোদ ঘরে ঢুকছিল, তা যেন শুধু আলো নয় একটা নরম আশ্বাস। ঈশিতা বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছিল। তার হাতটা আলতো করে রাখা নিজের পেটের উপর। এখনও তেমন কিছু বোঝার মতো নয়, তবু তার কাছে মনে হচ্ছিল এইখানেই তো শুরু হয়েছে এক নতুন পৃথিবী।
রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর থেকে তার ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি কাজ করছিল। এতদিনের অস্থিরতা, অপেক্ষা, ভাঙা আশা সব যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে।
বিরেন রান্নাঘরে ব্যস্ত। আগে কোনোদিন সে সকালে চা বানাতে ওঠেনি, কিন্তু এখন যেন সব বদলে গেছে। কেটলির শব্দ, কাপের টুংটাং আওয়াজ সবকিছুতেই একটা যত্নের ছাপ।
ঈশিতা চুপচাপ শুনছিল। তার চোখের কোণে অজান্তেই জল এসে যাচ্ছিল।
সে মা হতে চলেছে।
এই একটি বাক্য তার জীবনটাকে নতুন অর্থ দিয়ে দিয়েছে।
কিছুদিন পর এক বিকেলে হালকা বৃষ্টি নামল। ঈশিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ।
তার শরীর এখনও দুর্বল লাগে মাঝে মাঝে। হালকা বমিভাব, অকারণ ক্লান্তি তবু এই কষ্টগুলোকে সে আশীর্বাদ মনে করে। বিরেন পিছন থেকে এসে তার কাঁধে শাল জড়িয়ে দিল।
“ঠান্ডা লাগবে,” সে নরম গলায় বলল।
ঈশিতা হাসল।
“আমি এখন একা না।”
এই কথাটা বলার সময় তার চোখে যে আলো ছিল, বিরেন সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তুমি জানো,” ঈশিতা ধীরে বলল, “আমি মাঝে মাঝে ভয় পাই। এতদিন অপেক্ষার পর… যদি কিছু হয়ে যায়?”
বিরেন তার দুই হাত ধরে বলল,
“আমরা একসাথে আছি। আর এবার সব ঠিক হবে।”
ঈশিতা তার বুকে মাথা রাখল। সেই বুকের ধকধক শব্দের সঙ্গে যেন আরেকটা অদৃশ্য ছন্দ মিশে গেছে তার ভেতরের নতুন প্রাণের ছন্দ।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ঈশিতা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। নিজের মুখের দিকে তাকায়।
মনে হয় এই মুখটাই কি বদলে যাচ্ছে?
চোখে কি অন্যরকম কোমলতা এসেছে?
সে আলমারি খুলে পুরোনো কিছু ছোট জামা বের করে। এক আত্মীয়ের বাচ্চার জন্য একসময় কিনেছিল, তারপর আর দেওয়া হয়নি। জামাগুলো হাতে নিয়ে তার বুক কেঁপে ওঠে।
সে কল্পনা করে একটা ছোট্ট হাত তার আঙুল শক্ত করে ধরেছে।
একটা নরম মুখ তার বুকে লেপ্টে আছে।
রাতের অন্ধকারে কারও ক্ষুদ্র কান্না তাকে ডাকছে “মা…”
“মা” শব্দটা তার কানে বারবার বাজতে থাকে। কতদিন সে এই শব্দটা শুনতে চেয়েছে। কতবার হাসপাতালের করিডোরে বসে অন্য মায়েদের কোলে শিশু দেখে বুকের ভেতরটা হু হু করেছে। আজ সেই শূন্য জায়গায় আলো ঢুকছে।
ডাক্তার আল্ট্রাসাউন্ডের তারিখ ঠিক করে দিলেন। দিনগুলো যেন কাটতেই চাইছিল না। সেই নির্দিষ্ট সকালে তারা হাসপাতালে গেল। ঈশিতার হাত ঠান্ডা। বিরেন শক্ত করে ধরে আছে। মনিটরে ছোট্ট একটা বিন্দু দেখা গেল।
ডাক্তার বললেন, “এই যে, দেখুন। খুব ছোট এখনও।”
ঈশিতা পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। ছোট্ট, অস্পষ্ট একটা ছায়া। তার চোখে জল গড়িয়ে পড়ল।
এটাই তার সন্তান। তার ভেতরে একটা হৃদস্পন্দন শুরু হয়েছে। ডাক্তার যখন ক্ষীণ শব্দে হার্টবিট শোনালেন, ঈশিতার মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুর সে শুনছে।
বিরেনের চোখেও জল। সে ধীরে বলল, “শুনছ? আমাদের…”
ঈশিতা কিছু বলতে পারল না।
শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল।
মাস গড়াতে লাগল।
ঈশিতার শরীর বদলাতে শুরু করল। পেট একটু একটু করে গোল হচ্ছে। আগের জামাগুলো আর ঠিকমতো মানাচ্ছে না।
কিন্তু এই পরিবর্তনে তার বিন্দুমাত্র বিরক্তি নেই।
বরং আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তার মনে হয় সে যেন পূর্ণ হচ্ছে। কখনও রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। সে হাত রেখে দেখে সব ঠিক আছে তো? বিরেন পাশ ফিরেই জিজ্ঞেস করে, “কি হলো?”
“কিছু না… শুধু দেখতে ইচ্ছে করল।”
বিরেন আলতো করে তার পেটের উপর হাত রাখে।
দু’জনেই চুপ করে থাকে।
এই নীরবতার মধ্যে কত কথা!
ঈশিতা এখন খাবারের ব্যাপারে সতর্ক। সময়মতো ওষুধ খায়। হাঁটতে যায়।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে মনে।
সে আগের মতো হুটহাট রাগ করে না। ছোটখাটো কষ্টে ভেঙে পড়ে না। তার মনে হয় এখন তাকে শক্ত হতে হবে।
কারণ তার ভেতরে আরেকটা জীবন বেড়ে উঠছে।
এক সন্ধ্যায় হঠাৎ সে অনুভব করল পেটের ভেতরে যেন হালকা একটা টোকা। প্রথমে বুঝতে পারল না। আবার হলো।
সে স্থির হয়ে বসে রইল।
“বিরেন!” তার গলায় উত্তেজনা।
বিরেন দৌড়ে এলো।
“কি হয়েছে?”
“ও… নড়ছে মনে হয়!”
বিরেন অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
“সত্যি?”
ঈশিতা তার হাত নিজের পেটে রেখে দিল। কিছুক্ষণ পর আবার হালকা নড়াচড়া। বিরেনের মুখে যে বিস্ময় ফুটে উঠল, তা ভাষায় বোঝানো যায় না।
“এটা… এটা আমাদের ডাকছে?” সে ফিসফিস করল।
ঈশিতা হেসে উঠল, চোখে জল নিয়ে।
“হয়তো বলছে আমি আছি।”
সেদিন রাতটা তারা প্রায় ঘুমোয়নি। বারবার সেই ছোট্ট নড়াচড়া অনুভব করেছে।
ঈশিতার মনে হচ্ছিল তার শরীর এখন শুধু তার নয়।
সে একটা আশ্রয়।
একটা ঘর।
আত্মীয়-স্বজন খবর জানার পর বাড়িতে আনাগোনা বাড়ল। শুভেচ্ছা, উপদেশ, সতর্কতা সব মিলিয়ে এক অন্যরকম ব্যস্ততা। কেউ বলে, “এই বয়সে সাবধানে থাকো।”
কেউ বলে, “খুব ভগবানের কৃপা।”
ঈশিতা সব শুনে মৃদু হাসে।
সে জানে এই সন্তান শুধু দয়ার ফল নয়। এটা তার ধৈর্যের ফল, ভালোবাসার ফল।
একদিন তার এক বান্ধবী এসে বলল,
“তোকে এখন অন্যরকম লাগছে। যেন ভেতর থেকে আলো বেরোচ্ছে।”
ঈশিতা আয়নায় তাকিয়ে দেখেছিল সত্যিই কি তাই?
হয়তো মাতৃত্বের শুরুতেই নারীর মধ্যে এক অদৃশ্য দীপ্তি জেগে ওঠে।
তবে সবকিছুই শুধু আনন্দে ভরা নয়। মাঝেমধ্যে ভয় এসে চেপে বসে।
কোনো রিপোর্টের আগে রাতে ঘুম হয় না। পেটে হালকা ব্যথা হলেই বুক কেঁপে ওঠে। এক রাতে সে কেঁদে ফেলেছিল।
“আমি যদি ভালো মা হতে না পারি?” সে বলেছিল।
বিরেন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
“তুমি? তুমি তো ইতিমধ্যেই সবচেয়ে ভালো মা।”
“কিভাবে জানো?” “কারণ তুমি ওকে জন্মের আগেই এত ভালোবাসছ।” ঈশিতা ভাবল সত্যিই তো। মা হওয়া কি শুধু জন্ম দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ?
না, মা হওয়া শুরু হয় সেই মুহূর্তে, যখন একজন নারী নিজের চেয়ে আরেকটা প্রাণকে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখে।
গর্ভের শেষের দিকে এসে ঈশিতা হাঁটতে কষ্ট পায়। কিন্তু তবুও সে রাতে গল্প করে পেটের সঙ্গে।
“শোনো, তুমি ছেলে না মেয়ে তা আমার কিছু যায় আসে না,” সে বলে। “শুধু সুস্থ থেকো।” সে ছোট ছোট স্বপ্ন বুনতে থাকে।
প্রথম স্কুলের দিন।
প্রথম হাঁটা।
প্রথম ‘মা’ ডাকা।
এই কল্পনাগুলো তাকে ঘিরে রাখে। বিরেন মাঝে মাঝে মজা করে বলে, “তুমি তো ওর পুরো জীবন প্ল্যান করে ফেলেছ।”
ঈশিতা হেসে বলে,
“মা’রা এমনই হয়।”
অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত দিন এল।
হাসপাতালের সাদা করিডোর। আলো ঝলমলে অপারেশন থিয়েটার। নার্সদের ব্যস্ততা। ঈশিতার হাত শক্ত করে ধরে আছে বিরেন। তার চোখে ভয়, তবু সাহস দেখানোর চেষ্টা। “সব ঠিক হবে,” বিরেন বলল।
ঈশিতা মাথা নেড়ে চোখ বন্ধ করল। সময়ের হিসেব তখন আর নেই। কিছুক্ষণ পর এক তীব্র কান্নার শব্দ কানে এলো।
একটা নতুন কণ্ঠস্বর। নরম, অথচ জোরালো।
ঈশিতার চোখ খুলে গেল। তার বুকের ভেতর যেন বিস্ফোরণ ঘটল আনন্দে। আপনার বাচ্চা,” নার্স বলল।
ছোট্ট, লালচে মুখ। চোখ বন্ধ। হাত নড়ছে। ঈশিতা যখন প্রথমবার তাকে বুকে নিল, তার মনে হলো পৃথিবী থেমে গেছে। এই উষ্ণতা, এই নরম স্পর্শ এটাই কি স্বর্গ? তার চোখ বেয়ে অঝোরে জল নামছে। সে শুধু বলতে পারল, “আমার…” বিরেন পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
সে দেখছে তার স্ত্রী এখন শুধু স্ত্রী নয়, সে মা।
হাসপাতালের সেই প্রথম রাতে ঈশিতা ঘুমোয়নি।
বাচ্চা তার পাশে শুয়ে। মাঝেমধ্যে কান্না করছে। প্রথমবার বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় তার অস্বস্তি হচ্ছিল, তবু সেই মুহূর্তে সে অনুভব করল এই সংযোগের গভীরতা ভাষায় বলা যায় না। বাচ্চা তার আঙুল শক্ত করে ধরেছে।
ঈশিতা ভাবল এত ছোট্ট একটা প্রাণ তার উপর নির্ভর করছে। তার ভয় নেই আর। ক্লান্তি নেই। শুধু এক অদ্ভুত পরিপূর্ণতা।
বাড়ি ফেরার পর জীবন পুরো বদলে গেল।রাত জাগা। ডায়াপার বদলানো। হঠাৎ কান্না। তবু এই ক্লান্তির মধ্যেও ঈশিতা হাসে। একদিন দুপুরে বাচ্চা ঘুমোচ্ছে। ঈশিতা তার পাশে বসে আছে। সে হাত বুলিয়ে বলে, “তুমি জানো না, তুমি আমাকে কি দিয়েছ।” সে আগে নিজেকে অসম্পূর্ণ ভাবত। সমাজের কথা, আত্মীয়দের ইঙ্গিত সব তাকে কষ্ট দিত।
আজ সে জানে সে পূর্ণ।
মা হওয়া শুধু একটি পরিচয় নয়।
এটা এক অনুভব। এক গভীর, অদৃশ্য শক্তি।
মাস কেটে যায়। একদিন বাচ্চা অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলতে গিয়ে “মা… মা…” উচ্চারণের মতো শব্দ করল।
ঈশিতা স্থির হয়ে গেল। তার চোখে জল ভরে উঠল।
এতদিনের অপেক্ষা, এত রাতের স্বপ্ন সব যেন এক মুহূর্তে সত্যি হয়ে উঠল। সে বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
“আমি আছি,” সে ফিসফিস করে বলল।
এক সন্ধ্যায় ঈশিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল। বাচ্চা তার কোলে। বিরেন পাশে এসে দাঁড়াল।
“খুশি?” সে জিজ্ঞেস করল।
ঈশিতা মৃদু হেসে বলল,
“খুশির থেকেও বেশি কিছু।”
“কি সেটা?”
ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল
“আমি এখন জানি, ভালোবাসার আসল রূপ কি। নিজের ভেতর একটা প্রাণ ধারণ করা, তাকে পৃথিবীতে আনা, তার প্রতিটা নিশ্বাসে নিজেকে খুঁজে পাওয়া এই অনুভূতির কোনো তুলনা নেই।” আকাশে তখন লালচে আলো।
ঈশিতা তার সন্তানের কপালে চুমু খেল।
তার মনে হলো জীবন যত কষ্টই দিক, এই একটুখানি উষ্ণতা সবকিছুকে অর্থপূর্ণ করে দেয়।
সে আর শুধু ঈশিতা নয়।
সে মা।
আর এই একটি শব্দেই তার সমগ্র পৃথিবী ভরে গেছে।
পরের গল্পঃ বিদিশার খিদে ।।।।।
কেমন লাগলো কমেন্ট করে জানাবেন
কোনো মেয়ে বা বৌদি বা হট কাকিমা কথা বলতে চাইলে মেইল বা গুগল চ্যাট করতে পারেন
pathaksubhajit69@gmail.com
টেলিগ্রাম id : @Mrpathak_06